আজ শত ব্যর্থতা নিয়ে লিখতে বসেছি। দায়ভারে কলম নুয়ে পড়ছে। আজ হাতের মুঠোয় এক গুচ্ছ তাজা লাল গোলাপ কালো শুস্ক হয়ে যায়। শুভ্র মেঘগুলোর দিকে তাকালে ধুসর হয়ে বৃষ্টি ঝরায়। বুঝি না কেন জলরাশির সন্নিকটে আসলে জল শুকিয়ে হয় মরুভুমি। একি সময়ের স্রোত ?
থাক ঐদিকে নাই বা গেলাম। আমার ভালো কিছু একটা লিখতে হবে। ‘আজ’ এর জন্য লিখতে হবে। বন্ধু মুরাদের প্রস্তাব গ্রহণ করায় লিখতে হবে। যেহেতু আমি কবি ও লেখক (নিজের ঢোল নিজেকে আজকাল পেটাতে হয় ) শান্ত মুসাফির। ইতিমধ্যে দুএকটা কবিতা ও গল্প সাময়িকীতে ছাপা হয়েছে তাই নিজেকে কবি ও লেখক বলছি। জানি আমার এই ধৃষ্টতা সবাই ক্ষমার চোখেই দেখবে।তদপুরি আমি আবার ‘আজ’ সংগঠনের সভাপতি,তাই সবাই আমার কাছ থেকে ভিন্ন কিছু আশা করে। কিন্তু আমি কি আর ভিন্ন সবার থেকে। সবার মতই আমি একজন। তবুও সবার মাঝে থেকে নিজের মুদ্রাদোষে হয়েছি সবার থেকে আলাদা (জীবনানন্দের কবিতার লাইন মেরে দিলাম )। আমি আসলে সবার সাথে মিশেও হয়তবা কাউকে নিজের সাথে মিশতে দিই না। না নিজের কথাই বেশি লেখা হচ্ছে। এতটা স্বার্থপর হওয়া ঠিক না।
মুরাদ বলেছিল ‘আজ’ এর এক বছর পূর্তি উপলক্ষে একটা গল্প অথবা কবিতা লিখে দিতে,তাই লেখার চেষ্টা করি।

একটা কবিতা লেখার চেষ্টা করি,
প্রথম লাইনতো হলো এবার দ্বিতীয় লাইন,
তৃতীয় লাইনেও চলে আসলাম,
তবুও চতুর্থ লাইনে কবিতায় ঢুকতে পারলাম না।
এবার আমি লিখবই
কোন না বলা কথা;
একটা নতুন কিছু,
যে প্রয়াসে গঠিত হয়েছিল ‘আজ’
তা হয়ে গেছে অতীত।
স্বপ্নপূরণ আর স্বপ্নভঙ্গের নষ্টালজিয়া।
গোলাপের চারা ফুটে হলো ক্যাকটাস্
আবার ক্যাকটাস্রে ছোয়ায় লাল লাল রক্ত,
রক্ত থেকে রক্তজবা
তোমার না বলা যত কথা;
আজও বলা হলো না
বলা হবে না বুঝি কখনও
সপ্তদশ লাইনেই কবিতা শেষ হয় এখনও।

যাক কবিতাতো একটা হলো এবার গল্পে আসি।

প্রথমে গল্পের নায়কের সাথে পরিচয় করে দিই। সে এখন আজিজের দোকান থেকে একটা সিগারেট কিনে টানতে টানতে একটা রিক্সা খুজছে।সিগারেটের ধোয়া বের করে ‘ড্রাইভার’ বলে এক রিক্সায়ালাকে ডাকলো। সিলেটে রিক্সায়ালাকে ‘ড্রাইভার’ বলে(লন্ডনী ভারশন)। যাক গল্পের নায়কের নামতো দিতে হবে,নাম দিলাম এক অক্ষরের ‘শ’। শ রিক্সা করে ক্যাম্পাস যাচ্ছে। পরনে পাঞ্জাবী,জিন্সের প্যান্ট। কাধে শান্তিনিকেতনী ব্যাগ। ব্যাগে কিছু কবিতার পান্ডুলিপি। নতুন নতুন কবিতা লিখলে শ বন্ধুদের দেখায়। তাই সব সময় পান্ডুলিপি তার সাথেই থাকে। চলন্ত রিক্সায় বাতাসে শ এর লম্বা লম্বা চুলগুলো উড়ছে। সিগারেট প্রায় শেষের দিকে। রিক্সাও ক্যাম্পাসের কাছাকাছি চলে এসেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই রিক্সা শাবিপ্রবি ক্যাম্পাসের প্রবেশদ্বারের এককিলো রোডে প্রবেশ করলো। সম্পূর্ণ রাস—া নির্জন। রাস্তার দু ধারে বড় বড় গাছ। শীতের শেষের দিক। গাছের সব পাতা ঝরে ঝরে রাস—ায় পড়ছে, বাতাসে উড়ছে। খুব সুন্দর একটা শোঁ শোঁ শব্দ হচেছ। শ এর হঠাৎ মনটা খুব উদাস হয়ে গেল। মনে হলো, এমন সময় যদি তার পাশে কেউ একজন থাকত। যদি রূপা থাকত। রূপার হাত ধরে শ হাটছে। হাটছে আর হাটছে,দুজনেই নিরব। কারও মুখে কোন কথা নেই। শুধু নিরবতা। পথ যেন শেষই হচ্ছে না,তারা হেটে হেটে যাচ্ছে বহুদুর……..। না না এসব কি ভাবছি,শ নিজেকে প্রশ্ন করল। রূপার কথা কেন ভাবছি। রূপা তো এখন অন্যের। তারও হতে পারত,কিন্তু কিভাবে? মাত্র দু মাস সময়। তার মধ্যে দুই দিন কথা হয়েছে রূপার সাথে এর মধ্যে কি সব হয়ে গেল। মেয়েটার সবকিছুই কেন জানি শ এর ভাল লাগলো। তারপর কলেজ ভর্তি কোচিং এর দু মাস সময় শেষ,যে যার মত চলে গেল। কিন্তু শ এর মনে রূপা থেকে গেল। সেই হাসি থেকে গেল। সেই সুন্দর পবিত্র হাসি শ এর মনে রিনিঝিনি করে বাজতে লাগল প্রতিনিয়ত। এরপর চলে গেল দুবছর। শ ভুলতে পারল না রূপাকে,সেই অপলক দৃষ্টি জোড়া,সেই হাসি। শেষ পর্যন্ত ব›ধুদের সাহায্যে শ রূপার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করল। কিন্তু গল্পে ক্লাইমেক্স সৃষ্টি হলো তখনই যখন রূপা জানালো ও ওর খালাতো ভাইকে ভালবাসে আর তাকেই………(এই খালাতো ভাইরা সব সময়ই সমস্যা সৃষ্টি করে)। যাক রূপা কে আমাদের গল্পের নায়িকা করা গেল না। দেখা যাক সদ্য ছ্যাকা খাওয়া আমাদের নায়কের কী অবস্থা। সে বেচারার আর কী দোষ দিব। সে কি জানত রূপা যে অবার………।

রিক্সা এক কিলো রাস্তার প্রথম স্পিড ব্রেকারে উঠলো, শ এর চিন্তার একটু ব্যাঘাত ঘটল। শ আবার ভাবতে শুরু করল। ……ইস্ এই মূহুর্তে যদি ক্যাম্পাসের নতুন বন্ধু ইরা থাকত। ইরা মেয়েটাকে শ এর ভালই লাগে। মেয়েটা চমৎকার গান গায়,গানের প্রতি আবার শ এর বেশ দুর্বলতা আছে। ওকে ক্যাম্পাসে প্রথমে দুর থেকে দেখে শ একবার ভালরকম চমকে গিয়েছিল ,রূপা এখানে! পরক্ষণেই ঘোর কেটেছিল (এই ছ্যাকা খাওয়া পাবলিকের এই এক সমস্যা যেখানেই যাকে ভালো লাগে তার মধ্যে প্রিয়জনকে খোজার চেষ্টা করে)। শ ইরার সাথে নিজেই আগবাড়িয়ে বন্ধুত্ব করেছিল। এখন শ ভাবছে কাজটা বোধহয় ঠিক হয়নি। বন্ধুত্ব করতে হয় না, বন্ধুত্ব হয়ে যায়, বন্ধুত্বে সময় দিতে হয়। বন্ধুত্ব করার পর থেকেই ইরা কেমন জানি দুরে দুরে থাকে,মনে হয় বুঝি অনেক দিনের অচেনা। মজার ব্যাপার হলো ইরা শ কে বন্ধু হিসেবে নিয়েছে কি নেয় নি, শ এখনও ইরা কে বন্ধু হিসেবেই ভাবে। মানুষ কতই না রহস্যময়, রহস্য করতে তারা ভালবাসে।

রিক্সা এবার দ্বিতীয় স্পিড ব্রেকারে উঠলো। শ এর ভাবনায় এবার দ্বিতীয়বারের মত ব্যাঘাত ঘটল।রিক্সা চলতে শুরু করল। বিকেলের মৃদু মন্দ হাওয়া দিচ্ছে,পশ্চিমের আকাশে লাল সূর্যটা ঢুলে পড়ছে। আজ শ এর কয়েক বন্ধু মিলে করা সংগঠনের সাপ—াহিক আড্ডা। তারা প্রতি বৃহঃবার বিকেল ৫টায় সবাই মিলে বসে গল্প গুজব করে,মাঝে মাঝে ইরা গান গায় ,রাফি গান গায়। মাঝে মাঝে সমসাময়িক বিষয় নিয়ে,ক্যাম্পাস নিয়ে ,বন্ধুদের নিয়ে কত মজার মজার আলোচনা হয়। কে প্রেমে পড়ল ,কে ইনস্টান ছ্যাকা খেল,কে সব সিলেবাস পড়ে শেষ করে ফেলেছে আরও কত কি….। ইস্ কি মজাই না হয়। তখন মনে হয় জীবন অনেক সুন্দর ,সব দুঃখ ঘুচে যায়। মনটা একদম সজীব হয়ে উঠে। সিলেটে এসে ক্যাম্পাসে প্রথম খুব একা একা লাগত,রূপার স্মৃতিরা এসে ঘিরে ধরত,পরে দু একটা বন্ধু হলো, শুধু বন্ধু বললে ভুল হবে ,বন্ধুর মত বন্ধু। সবাই মিলে একটা সংগঠন করলাম। সংগঠন থেকে পিকনিক করা হলো, সব বন্ধুদের জন্মদিন পালন করা হলো,নিজেকে তখন খুব মহান,খুব বড় মনের মনে হত লাগল। কিন্তু কিছুদিন ধরে কি যেন হলো,সংগঠনের বন্ধুদের মাঝে কেমন জানি গ্যাপ সৃষ্টি হলো। সংগঠনের বন্ধু শিরিন হঠাৎ প্রেমে পড়ে গেল,ইরা কেমন জানি আনমনা হয়ে গেল,কারও সাথে তেমন কথা বলে না ,সব সময় একা একা থাকে। রসি আবার পলিটিক্সে জড়িয়ে গেল, সবাই অন্যরকম হয়ে যাচ্ছে। এখন ঠিক আগের মত আড্ডা হয় না। আড্ডাতে কেউ আর মজাও পায় না।

রিক্সা এক কিলোর শেষ স্পিড ব্রেকারে উঠলো,শ এর চিন্তায় আবারও ব্যাঘাত ঘটল। রিক্সা এবার গোলচক্কর পার হয়ে লাইব্রেরি বিল্ডিং এর পাশে এসে থামল। এখানেই শ এর সংগঠনের আড্ডা হওয়ার কথা। কিন্তু কোথায় আড্ডা ,কেউ তো নেই। তনু আর রাজু ঘাসের উপর শুয়ে সিগারেট টানছে,রাফি একমনে রাস্তা দিয়ে হাটছে,সৈকত পোস্ট অফিসে চলে গেল,মজনু অসুস্থ সে আসে নি আর পল লাইব্রেরির সিড়িতে বসে আছে, অন্যরা কেউ নেই।

না গল্পটা বেশ বড় হয়ে যাচ্ছে। শেষ করা দরকার। এখন আমাদের গল্পের নায়ক মন মরা হয়ে বন্ধুদের নিয়ে ঘাসের উপর বসে সূর্যাস্ত দেখছে। দেখতে দেখতে একবার সূর্যটা অদৃশ্য হয়ে রূপার মুখ ভেসে উঠলো। কিছুক্ষণ পর মুছে গেল আবার সেই লাল টুকটুকে অস্তমিত সূর্য। হঠাৎ আবার ইরার মুখ ভেসে উঠলো,ইরা গান করছে সবাই মিলে তা শুনছে। আবার মুছে গেল। আবার সেই সূর্য। শ এসব আর সহ্য করতে পারল না,দু চোখ বন্ধ করে ফেলল। শ ভাবতে লাগল,এক্ষণি ইরা,শিরিন,রসি এসে বলবে কিরে তোরা সব থম্ মেরে বসে আছিস চল সবাই ক্যান্টিনে চা খেতে যাই। তারা দলবেধে সব চা খেতে গেল। চায়ের বিল স্পন্সর করল শিরিন ,কারণ আজকে তার মনটা খুব ভাল। কারণ আজ শিরিনকে নাকি ঐ ছেলেটি অফার করেছে। শিরিনও সে প্রস—াব গ্রহন করেছে। তাই ……………। শ এর এসব ভাবতে ভালই লাগছে, সে চোখ বন্ধ করেই আছে। হঠাৎ ঘাড়ে আলতো করে একটা হাতের স্পর্শ পেল, ওরা কি তবে সত্যি ফিরে এসেছে, নাকি এটা ভ্রান্তি ………….।

না, বেশ ভাবগম্ভীর ভাবে শেষ হলো গল্পটা। এবার একটু হালকা কথা বলে লেখা শেষ করি,একটা জোকস্ বলি। একবার একলোককে নির্বাসনে যাওয়ার আগে তার শেষ ইচ্ছার কথা জানতে চাওয়া হলো,লোকটি কয়েক কার্টুন সিগারেট চাইল। সিগারেট নিয়ে মনের আনন্দে লোকটি চলে গেল। নির্বাসন শেষে ফিরে এলে দেখা গেল লোকটির চেহারা উসকো খুশকো আর ঠোটে একটা সিগারেট,চোখগুলো লাল টকটকে। একজন লোক তার নির্বাসন কেমন কাটল জানতে চাইল সে উত্তর দিল,‘তাড়াতাড়ি আমাকে একটু আগুন দিন। ফাজিলগুলো সিগারেট দিয়েছে সাথে ম্যাচ দেয়নি।’ আমাদের ‘আজ’ এর অবস্থা ঠিক সেরকম সবাই আমরা ‘আজ’ এ আছি নিস্ক্রিয় সিগারেটের মত কিন্তু তাকে সক্রিয় করার মত ‘আগুন’ মানে ‘মন’টুকু নেই।

একবারও কি বন্ধুরা ভেবে দেখেছো তারারাও যত আলোকবর্ষ দুরে,তারও দুরে তুমি আর আমি যাই ক্রমে সরে সরে। তবু আমি এখনও স্বপ্ন দেখি ‘আজ’ থাকবে,যতদিন আমি আছি,আমরা আছি,নিস্ক্রিয় সিগারেটের মতন নয়, জলন্ত সিগারেটের মত। সিগারেট যদিও শেষ হয় তবে ‘আজ’ থাকবে অনন—ময় ………….। শেষে শুধু এটুকু বলে যাই,
‘এই মূহুর্তে
বোকারা সপ্ন দেখে পৃথিবীটা সাজাবার।’
আমরা যেন আবার সেই ‘বোকারা’ না হয়ে যাই।
-শান্ত মুসাফির
১৩/০৪/২০০৭
৩০ চৈত্র ১৪১৩

Spread the love
Categories: Uncategorized